বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে স্মৃতির ঝাঁপি থেকে কয়েকটি ঘটনা চয়ন করে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করার এই সুযোগে আমি অভিভূত। গোলাপবাগের সিক্ত মাটির গন্ধ এখনো আমার চেতনায় প্রবহমান। অনেকদিন আগেকার কথা, বছর তিরিশের বেশি। সেদিন আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক বৈদ্যনাথ চৌধুরী মহাশয় এর টর্ট ক্লাসে তাঁর শেখানো ম্যাক্সিম "ইউবি যাস আইবি রেমেডিয়াম" আমার মনের মধ্যে খেলা করছিল। ক্লাস শেষ হওয়ার পর গোলাপবাগ থেকে বাস ধরে বর্ধমান স্টেশনে পৌছলাম। আমি তখন থাকতাম দুর্গাপুরে। সেখান থেকে বর্ধমান রোজ ট্রেনে যাতায়াত করতাম অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে। এই ট্রেন যাত্রার জন্য আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস কন্সেশন ফর্ম ভর্তি করে অল্প ভাড়ায় যাতায়াত করতাম। সবে প্রথম কয়েকমাস হয়েছে আমি ডেইলি প্যাসেঞ্জার। চলার পথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কিছু অংশ প্রায় মনে পড়তো, যেমন - "ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী একা একা করি খেলা, আনমনা যেন দিকবালিকার ভাসানো মেঘের ভেলা।" বর্ধমান স্টেশন থেকে আমি এবং আমার সহপাঠীরা সেই দিন অমৃতসর এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠলাম দুর্গাপুর যাওয়ার জন্য। ওটা ছিল স্লিপার ক্লাস কম্পার্টমেন্ট। ফাঁকা জায়গা দেখে আমার কিছু সহপাঠীদের সাথে লোয়ার বার্থে বসার অবকাশ পেয়েছিলাম। বর্ধমান স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালো কোট গায়ে দেওয়া একজন লোক সব প্যাসেঞ্জারদের টিকিট চেক করছিলেন। বুঝলাম, ইনিই ট্রেনের টিকিট কালেক্টর। আমাদের কাছে আসতেই আমাদের মধ্যে একজন বন্ধু বলল, যে আমরা ছাত্র। আমার কাছে ওই স্টুডেন্ট কন্সেশন এর টিকিট ছিল, কিন্তু আমি দেখাইনি। সেই সময় ওই টিকিট কালেক্টর আমার বিপরীত দিকের আপার বার্থের একজন ব্যক্তি, যে আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল, তার কাছে টিকিট দেখতে চাইল। ওই প্যাসেঞ্জার কোন সাড়া শব্দ না করাতে ওই টিকিট কালেক্টর পরের বার্থগুলি চেক করার জন্য চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর কালেক্টর ভদ্রলোক সামনের বার্থের ওই আপাদ মস্তক কম্বলমুড়ি দেওয়া ব্যক্তির গায়ে টোকা দিয়ে টিকিট দেখতে চাইলেন। জানিনা কেন ওই মুহূর্তে আমি ঐ টিকিট কালেক্টর ভদ্রলোককে বললাম, যে ওই ব্যক্তিটি ছাত্র। তাই শুনে ওই টিকিট কলেক্টর ভদ্রলোক চলে গেলেন। তখন ট্রেনটি কিন্তু দ্রুতগতিতে তার গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমি তখন ওই উপরের বার্থের অজানা ব্যক্তিটির গায় আস্তে আস্তে টোকা দিয়ে তুলি। সেই ব্যক্তিটি কম্বল সরিয়ে আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছিল। ব্যক্তিটিকে দেখে আমার মনে হল যে সে আমার সমবয়সী একটি ছেলে। ওই ব্যক্তিটির সাথে কথা বলব বলে তাকে আমি উপরের বার্থ থেকে নিচে নামতে বললাম। আমরা দুজনে তারপর পাশের কুপেতে ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ও আর্তনাদের ছাপ, মাথার এলোমেলো চুল, ভাঙা গলায়, তার হারানো সুর। পরনে তার অতি সাধারন পোশাক। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে সে কোথায় যাবে, সে বলল যে অমৃতসর যাবে কাজের জন্য কারণ তার বাবা মৃত্যু শয্যায়, তাই তার ওষুধ কেনার পয়সা জোগাড় করতে যাচ্ছে। সে আরও বললো যে সে অমৃতসরে যাচ্ছে বিনা টিকিটেই কারণ তার কাছে পয়সা নেই। আরো জিজ্ঞাসা করতে সে বললো যে তার বাড়ি গলসির এক গ্রামে, যেখানে তার বৃদ্ধা মা থাকেন। সে জানাল, যে তার দাদা আছে কিন্তু বৌদির সাথে একই টালির চালের ঘরে আলাদা থাকে। আরও জানলাম, যে তার দাদা বাবার সব জমি নিয়ে নিয়েছে এবং বাবা মাকে দেখেনা। এখানে বেকারত্বের জ্বালা, তাই সে অমৃতসরে কাজের খোঁজে যাচ্ছে। আমি তাকে বললাম যে তুমি যে অমৃতসর যাচ্ছ, ধরে নাও সেখানে চাকরিও পেয়ে গেলে, কিন্তু একমাস পরে যখন তুমি বাড়ি ফিরে আসবে, তখন তোমার বাবা আর মা কোথায় থাকবেন তা কি তুমি জানো। তখন সে আমাকে বলল যে সেই দিনই ভোর রাতের অন্ধকারে কিছু না জানিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তখন এক চা ওয়ালা চা বিক্রি করার জন্যে ওই কম্পার্টমেন্ট-এ "চায়ে, গরম চায়ে ...." বলে হাঁক দিতে দিতে যাচ্ছিল। আমি তাকে দাঁড় করিয়ে দুই ভাঁড় চা কিনলাম। এক ভাঁড় চা ওই গলসির ছেলেটার হাতে তুলে দিলাম। আমি ওই মাটির ভাঁড়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে কোথায় যেনো মাটির উষ্ণতার স্পর্শ খুঁজে পাই। আমি তাকে বললাম যে তুমি বাড়ি ফিরে যাও, তোমাকে দেখেই তোমার বাবা-মা সুস্থ্য হয়ে যাবেন। ওই ছেলেটি চুপ করে আমার সব কথা শুনল। ইতিমধ্যে ট্রেনটি ধীরে ধীরে রাজবাঁধ স্টেশন ছাড়িয়ে দুর্গাপুর স্টেশনের দিকে ছুটতে লাগলো। দুর্গাপুর স্টেশন আসতেই আমি ওই ছেলেটিকে নিয়ে দুর্গাপুর স্টেশনে নামলাম। নামল আমার সহপাঠীরাও। এরমধ্যে বলে রাখা ভালো, যে আমি কিছু ফ্রী-অফ-কস্ট প্রাইভেট টিউশন পড়াতাম যা পয়সার জন্য নয়, শুধু আগে যা পড়াশোনা করেছি তা মনে রাখার জন্য। হ্যাঁ, কিছু পারিশ্রমিক পেতাম, যে যা দিতেন। সেইসময় আমার পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে দেখলাম যে আমার কাছে সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি আছে। গুনে গুনে ৩০০০ টাকা ওই ছেলেটার হাতে দিলাম। প্রায় সন্ধ্যে হয়ে আসছে। স্টেশনের চায়ের দোকান থেকে আমি কিছু কেক ও বিস্কুট কিনে ওকে প্যাকেটে ভরে দিলাম। তারপর ওভার ব্রিজ পেরিয়ে টিকিট কাউন্টার থেকে দুর্গাপুর স্টেশন থেকে বর্ধমান স্টেশন যাওয়ার লোকাল ট্রেনের টিকিট কেটে ওকে দিলাম। তখন স্টেশনে এনাউন্সমেন্ট করছে যে বর্ধমান যাওয়ার লোকাল ট্রেন ওয়ারিয়া স্টেশন ছেড়েছে। ওই সময় আমার সাথে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের যোগাযোগ থাকার সুবাদে আমি দুর্গাপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন সংগঠনের ছাত্র ছাত্রীদের চিনতাম। সেই দিন ওই সময় দুর্গাপুর স্টেশনে একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের চেনা ছাত্রকে দেখলাম যে বর্ধমান যাচ্ছিল। আমি তাকে বলে দিলাম যে ওই ছেলেটিকে বর্ধমানের নেমে গলসি যাওয়ার বাসে চাপিয়ে দিতে। ওই ছেলেটি বলল দাদা আপনি চিন্তা করবেন না। ট্রেনে ওঠার সময় গলসির ছেলেটি আমার নাম ও ঠিকানা জানতে চাইলে আমি আমার নাম বলি এবং আরো বলি যে আমার ঠিকানা হল "দ্য ডিপার্টমেন্ট অফল, দ্য ইউনিভার্সিটি অফ বর্ধমান"। তারপর ট্রেন দুর্গাপুর স্টেশন ছেড়ে চলে গেল। তার সঙ্গে সঙ্গে আমার মন থেকেও তখন এই ঘটনা মুছে গিয়েছিল। কারণ, এই রকম ঘটনা তো সকলের জীবনে কোন না কোন সময় ঘটে। শুধু বাড়িতে এসে মাকে বলেছিলাম পুরো ঘটনাটা। মা বলেছিলেন ভালো করেছিস। প্রায় দেড় মাস বাদে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়নের এক সিনিয়র দাদা আমাদের ল ডিপার্টমেন্টে এসে আমাকে একটি ইনলান্ড লেটার দেয়। আমি ইনলান্ড লেটার টি গ্রহণ করার পর দেখি প্রেরকের নাম নেই। হ্যাঁ আমার নামেই ইনলান্ড লেটার টি পাঠানো হয়েছে। ওই ইনলান্ড লেটারটি সন্তর্পনে এক বন্ধুর সামনে খুলি। সেখানে লেখা আছে "শ্রদ্ধেয় দাদা, আমি আপনার গলসি ভাই বলছি। আপনার কথাই ঠিক হয়েছে। আমি যখন বাড়ি ফিরি তখন লন্ঠনের আলোয় দেখি যে বাবা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন, আর তাঁর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। মা আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের মুখের হাসি আমি চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম। আমার মনে হলো যে আমি আবার স্বর্গে ফিরে এসেছি। দাদা, আমি আপনার সব কথা বলেছি। মা আমাকে বলেছেন যে তোর দাদাকে আমাদের ঘরে আসতে বল, আমি ওনাকে দেখতে চাই, ওনাকে ভগবান দূত হিসেবে তোর সাথে দেখা করিয়ে দিয়েছেন।........ বাকি লেখাগুলো আর আমি পড়িনি। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। আমি তখন আমার ওই বন্ধুর সামনে ওই ইনলান্ড লেটার টা টুকরো টুকরো করে আমাদের গোলাপবাগের সবুজ গালিচার উপরে ছড়িয়ে দিই। নাম না জানা গলসির ওই ছেলেটি নিশ্চয়ই এখন ভালো আছে। আমাদের গোলাপবাগের গোলাপ ফুলেরা হয়তো জানে সেই খবর।


Share: